টাইম ম্যাগজিনে 'গ্লোবাল হিরো' আমাদের আবুল হুসসাম

"চলে যাব - তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রানপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,

তারপর হব ইতিহাস।।"

সুকান্তের বিখ্যাত এই 'ছাড়পত্র' কবিতার মতোই দৃঢ় শপথ ছিল ডক্টর হুসসামের। প্রাণপণে পৃথিবীর 'জঞ্জাল' আর্সেনিকের মতো মৃত্যুদূতের ছোবল থেকে
Hussamবাংলাদেশকে মুক্ত করে শিশুর বাসযোগ্য করার প্রত্যয়ও ছিল মনে। নবজাতকের কাছে দৃঢ় অঙ্গিকার থেকেই হয়তো চিকিৎসক ভাই আবুল মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ সাধনায় তৈরি করে ফেলেন আর্সেনিক শুদ্ধির 'সোনো ফিল্টার'। ফলাফলে বিশ্ববনেদি টাইম ম্যাগাজিনের 'গ্লোবাল হিরো অফ দ্যা এনভায়রনমেন্ট' অ্যাওয়ার্ড ধরা দিয়েছে ডক্টর আবুল হুসসামের কাছে।

বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের নিয়মিত বাৎসরিক আয়োজন 'গ্লোবাল হিরো অফ দ্যা এনভায়রনমেন্ট' অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা করা। চলতি সপ্তাহে এবছরের হিরোদের নামও ঘোষণা করেছে টাইম ম্যাগাজিন। সেই তালিকায় এবার স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগি অধ্যাপক ডক্টর আবুল হুসসাম। তার আবিষকৃত খাবার পানি থেকে আর্সেনিক মুক্ত করার ফিল্টারের জন্য পেয়েছেন এই পুরস্কার। তিনি এবং তার
Hussamছোট ভাই ডক্টর আবুল মুনির দু'জনে মিলে তৈরি করেন 'সোনো ফিল্টার' নামে এই খাবার পানি থেকে আর্সেনিক নিষ্কাশন করার যন্ত্র। তাদের তৈরি এই যন্ত্র টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে নির্বাচিত হয়েছে ২০০৭ সালের পরিবেশ বিষয়ক অন্যতম সেরা আবিষ্কার হিসেবে।

২৫ অক্টোবর (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাতে) দেওয়া হবে এই পুরস্কার। ডক্টর হুসসাম ছাড়াও এবারের পুরস্কার প্রাপ্তদের তালিকায় নাম রয়েছে বিলুপ্ত সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভ, আমেরিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং শান্তিতে এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আল গোর, ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স চার্লস এবং জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যারকেলের। লিডারস অ্যান্ড ভিশনারিজ, এ্যাকটিভিস্ট, সাইন্টিস্ট অ্যান্ড ইনভেন্টরস এবং মুঘলস অ্যান্ড এন্টারপ্রেনিয়ারস এই চারটি ক্যাটাগরিতে প্রদান করা হচ্ছে এওয়ার্ডগুলি। আবুল হুসসামকে সাইন্টিস্ট অ্যান্ড ইনভেনটরস ক্যাটাগরিতে দেয়া হচ্ছে এই পুরস্কার।

এক নজরে ডক্টর আবুল হুসসাম
আবুল হুসসামের জন্ম ১৯৫২ সালে কুষ্টিয়াতে। তিনি বড় হয়েছেন সেখানেই এবং তার প্রাথমিক পড়াশুনাও কুষ্টিয়াতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে
Hussamতিনি রসায়নে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন ।

১৯৮৬ সালে পেনিসেলভেনিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ পিটস্‌বার্গ থেকে অর্জন করেন পিএইচডি ডিগ্রি। ইউনিভার্সিটি অফ মিনিসোটার রসায়ন বিভাগ থেকে পোষ্ট-ডক্টরাল ট্রেনিং সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি কাজ করছেন জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ও প্রাণরসায়ন বিভাগে। এছাড়া তিনি রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেস ওয়েষ্টার্ন রিসার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ডক্টর হুসসাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আনাডারগ্রাজুয়েট ও গ্র্যাজুয়েট লেভেলে পড়ান কোয়ান্টিটেটিভ কেমিক্যাল এনালাইসিস, ইন্সট্রুমেন্টাল এনালাইসিস, ইলেক্ট্রো-এনালাইটিক্যাল কেমিষ্ট্রি এবং থিওরি অফ এনালাইটিক্যাল প্রসেস বিষয়ে। তিনি গবেষণা করেছেন ইলেক্ট্রো-এনালাইটিকাল কেমিষ্ট্রি, এনভায়রনমেন্টাল কেমিষ্ট্রি ও অর্গানাইজড মিডিয়া কেমিষ্ট্রি নিয়ে।

প্রথমদিকে ডক্টর হুসসাম তৈরি করেন বেশ কিছু কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ইলেকট্রোকেমিক্যাল এনালাইজার, অটোমেটেড টাইট্রেশন সিস্টেম এবং বেশ মূল্যবান এক ধরনের গ্লাস ক্রোমাটোগ্রাফ যার মাধ্যমে তিনি জটিল কোন ধরনের মিডিয়াতে প্রবাহিত পদার্থের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন । তার এই আবিষ্কারটিই তাকে সূযোগ করে দেয় ভূ-গর্ভস্থ পানির অবস্থা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার। বিভিন্ন জার্নাল ও বইয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০ টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ডক্টর হুসসামের তবে তার বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এসেছে এই আর্সেনিক ফিল্টার আবিষ্কারের পর।

আবুল হুসসামের আবিষ্কার
টাইম ম্যাগাজিনের মতে, খাবার পানির বিষক্রিয়া বিশ্বের মারাত্মক প্রাকৃতিক দূর্যোগগুলোর একটি। এটা জেনেও হাত গুটিয়ে বসে থাকার মানুষ নন ডক্টর
Hussamহুসসাম। তার যুগপৎ গবেষণার ফসল হিসেবে বিশ্ব পেল আর্সেনিক নিষ্কাশনের খুব সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী এক ফিল্টার। তবে আর্সেনিক নিয়ে গবেষণা আবুল হুসসামের জন্য অচেনা জগৎ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রোকেমিক্যাল কেমিষ্ট্রি পড়ানোর সময় নিজ জেলা কুষ্টিয়ার ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ তাকে আগ্রহী করে তোলে। একই সময়ে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চল এবং পশ্চিমবঙ্গে আর্সেনিক বিষক্রিয়া নিয়ে কাজ করেছেন অনেক বিজ্ঞানী। আর্সেনিকের মাত্রা সম্পর্কে এসব অঞ্চলেও তারা প্রায় একই রকমের ফলাফল পেয়েছেন।

আর্সেনিকের প্রধান সমস্যা হলো এর রং, স্বাদ, গন্ধ কোনটাই নেই। তাই খালি চোখে এর মাত্রা বোঝা সম্ভব হয় না। কিন' এটা শরীরে নির্ধারিত মাত্রার চাইতে বেশি প্রবেশ করলে নার্ভ ড্যামেজ থেকে শুরু করে ক্যান্সার পর্যন- হতে পারে। তবে হুসসামের গবেষণার লক্ষ্য অন্যদের চাইতে ভিন্নতর ছিল। তিনি চেয়েছিলেন তার আবিষ্কার করা যন্ত্রটি হবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে, কার্যকর ও পরিবেশ সহনশীল। তিনি আবিষ্কার করলেন 'সনো ফিল্টার'।

হুসসামের এই ফিল্টারটির সঙ্গে অনেকটাই মিল খুঁজে পাওয়া যাবে আর্সোনিক নিষ্কাশনে এর আগে বহুল ব্যবহৃত তিন কলসি ফিল্টারের। তার ফিল্টারে ব্যবহার করা হয়েছে কয়েক স্তরের পদার্থ। এতে প্রাথমিক নিষ্কাশনের কাজ করে 'কম্পোজিট আয়রন ম্যাট্রিক্স' বা সিএমএ। এটা তৈরি করা হয় কাষ্ট আয়রন থেকে যা বাংলাদেশের কারখানায় তৈরি করা সম্ভব। প্রাথমিকভাবে ভূ-গর্ভস্থ আর্সেনিকের মৌলগুলো বিক্রিয়া করে এর ফেরাস হাইড্রোক্সাইড আয়নের সঙ্গে এবং অক্সিডেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আর্সেনিককে দূর করে পানি থেকে। এই ফিল্টারে আয়রন ম্যাট্রিক্সের সঙ্গে আরো ব্যবহার করা হয় নদীর বালু, কাঠকয়লা এবং ভেজা ইটের টুকরা, যার সাহায্যে আর্সেনিক ছাড়াও নিষ্কাশন করা যায় খাবার পানির আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও অন্যান্য অজৈব পদার্থগুলো।

সাধারণত তিনটি বালতি একটার উপর একটা বসিয়ে তৈরি করা হয় এই সোনো ফিল্টার যেখানে তৃতীয় বালতিতে জমতে থাকে বিশুদ্ধ পানি। তবে গ্রামাঞ্চলের জন্য এর আরো একটা মডেল আছে যেখানে তৃতীয় বালতির বদলে একটা কলসি বসানো হয়। এটা খাবার পানি থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত আর্সেনিক ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ নিষ্কাশন করতে পারে। এর দাম পড়ে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। একটা ফিল্টার দিয়ে দুটো পরিবার তাদের দৈনন্দিন কাজ সারতে পারে এবং একেকটা ফিল্টারের আয়ু গড়ে প্রায় ৫ বছর।

এই ফিল্টারের আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, ৫ বছরে একে পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই।

আবুল হুসসাম প্রথম আলোচনায় আসেন এ বছরের শুরুর দিকে। গত ফেব্রুয়ারিতেই তিনি ইউএস ন্যাশেনাল একাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে অর্জন করেন ১ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ২০০৭ গ্রেঞ্জার চ্যালেঞ্জ প্রাইজ। তবে এই এক মিলিয়ন ডলারের ৭০ শতাংশ তিনি দান করেন দরিদ্র জনগোষ্টির ঘরে আর্সেনিক ফিল্টার পৌঁছে দেবার জন্য, ২৫ শতাংশ ব্যয় করেন আর্সেনিক বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করার কাজে এবং ৫ শতাংশ অর্থ দান করেন তার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডে। এ পুরস্কারটা দেয়া হয় মূলত ইলিনয়েসে লেক ফরেস্টে অবস্থিত গ্রেঞ্জার ফাউন্ডেশনে উদ্যোগে। এই বছর তাদের লক্ষ্য ছিলো আর্সেনিক সমস্যা সমাধানে এমন একটা পরিবেশবান্ধব ও ক্রয়সাধ্য যন্ত্র তৈরি করা যা কোন ধরনের বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার না করে কাজ করে।

বাংলাদেশের কয়েক হাজার পরিবার এখন ব্যবহার করছে এই সনো ফিল্টার। ডক্টর হুসসামের ইচ্ছা, এ ফিল্টারটাকে প্রথমে ভারত ও নেপাল এবং পরে দক্ষিণ
Hussam5আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা। টাইম ম্যাগাজিনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হুসসাম বলেন, "মানুষজন তাকে বলেছে কিভাবে এই ফিল্টারটা ব্যবহার করার পরে তাদের শরীরে আর্সেনিক বিষক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে আগের বিষক্রিয়ার চিহ্ন বিদায় নিয়েছে। এমনকি কোন কোন জায়গায় মহিলারা নাকি তাদের চুল ধোয়ার কাজে এই পানি ব্যবহার করছে। এটা নাকি তাদের চুলকে মসৃণ রাখে।"

আর্সেনিক ঝুঁকির মধ্যে থাকা বিশ্বের ১৩ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষকে এই বিষক্রিয়ার হাত থেকে মুক্তির পথ বাতলে দিয়ে ডক্টর হুসসাম টাইম ম্যাগাজিন বা গ্রেঞ্জার ফাউন্ডেশনের চোখে শুধু হিরো হলেও, বিশ্বমানবের জন্য তিনি আরো বেশি কিছু। বিশ্বকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলার অসামান্য কাজ করে তিনি শুধু নিজেকে নয়, বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকেও করেছেন সম্মানিত।

এ সম্মান আবুল হুসসামের।
এ সম্মান সব বাংলাদেশীরই।।

 Source: www.bdnews24.com

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ/মুহম্মদ খান/এমএ/২১০৫ ঘ./২৫.১০.০৭